তথ্য বিডি

ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনী – বয়স, স্ত্রী, সন্তান, সিনেমা, পরিবার ও ক্যারিয়ার

ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনী, ইলিয়াস কাঞ্চন, ইদ্রিস আলী

ইলিয়াস কাঞ্চন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একজন জনপ্রিয় অভিনেতা। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি রোমান্টিক, সামাজিক, পারিবারিক ও অ্যাকশনধর্মী বিভিন্ন ধরনের সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন। ১৯৭৭ সালে ‘বসুন্ধরা’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক হয়। এরপর কয়েক দশকের ক্যারিয়ারে তিনি কয়েকশ সিনেমায় অভিনয় করেছেন।

অভিনয়ের পাশাপাশি ইলিয়াস কাঞ্চন বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৯৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রথম স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যুর পর তিনি ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলন গড়ে তোলেন। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে আসছেন।

Table of Contents

ইলিয়াস কাঞ্চনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

  • নাম: ইলিয়াস কাঞ্চন
  • পারিবারিক নাম: ইদ্রিস আলী
  • জন্ম: ২৪ ডিসেম্বর ১৯৫৬
  • জন্মস্থান: আশুতিয়াপাড়া, করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ
  • শিক্ষা: কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • পেশা: অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক ও সমাজকর্মী
  • চলচ্চিত্রে অভিষেক: বসুন্ধরা (১৯৭৭)
  • পরিচিত সিনেমা: বেদের মেয়ে জোছনা, পরিণীতা, ভেজা চোখ, নীতিবান, সিপাহী, ত্যাগসহ আরও অনেক সিনেমা
  • প্রথম স্ত্রী: জাহানারা কাঞ্চন
  • দ্বিতীয় স্ত্রী: পারভীন সুলতানা দিতি
  • সন্তান: মিরাজুল মঈন জয় ও ইশরাত জাহান ইমা
  • সামাজিক উদ্যোগ: নিরাপদ সড়ক চাই
  • উল্লেখযোগ্য সম্মাননা: জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একুশে পদক ও অন্যান্য পুরস্কার

ইলিয়াস কাঞ্চনের জন্ম ও শৈশব

ইলিয়াস কাঞ্চন ১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার আশুতিয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম ইদ্রিস আলী। তাঁর বাবা হাজী আব্দুল আলী এবং মা সরুফা খাতুন।

ছোটবেলা থেকেই অভিনয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। স্কুলজীবনে নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি স্কাউটিং ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। পরবর্তীতে রবীন্দ্রসংগীতের তালিম নেওয়ার পাশাপাশি নাচও শেখেন।

ইলিয়াস কাঞ্চনের শিক্ষা

ইলিয়াস কাঞ্চন ১৯৭৫ সালে কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া যায়।

তবে অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে ওঠে। ছাত্রজীবনেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকায় চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়।

ইলিয়াস কাঞ্চনের অভিনয় ক্যারিয়ার

ইলিয়াস কাঞ্চনের চলচ্চিত্রজীবনের শুরু হয় ১৯৭৭ সালে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘বসুন্ধরা’ সিনেমার মাধ্যমে। এই সিনেমায় তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন ববিতা। প্রথম সিনেমার পর ধীরে ধীরে তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরি করতে থাকেন।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে ইলিয়াস কাঞ্চন নিয়মিত সিনেমায় অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত সিনেমার মধ্যে ‘পরিণীতা’, ‘ভেজা চোখ’, ‘নীতিবান’, ‘অভিযান’, ‘সিপাহী’, ‘ত্যাগ’, ‘স্বজন’, ‘বেপরোয়া’, ‘চেয়ারম্যান’ সহ আরও অনেক সিনেমা উল্লেখযোগ্য।

তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি হলো ‘বেদের মেয়ে জোছনা’। তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত এই সিনেমাটি ১৯৮৯ সালে মুক্তি পায়। এতে ইলিয়াস কাঞ্চনের বিপরীতে অভিনয় করেন অঞ্জু ঘোষ। সিনেমাটি সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং ইলিয়াস কাঞ্চনকে দর্শকদের কাছে আরও বড় তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ইলিয়াস কাঞ্চন ৩০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।

ইলিয়াস কাঞ্চনের জনপ্রিয় সিনেমা

ইলিয়াস কাঞ্চনের উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • বসুন্ধরা
  • সুন্দরী
  • শেষ উত্তর
  • মোহনা
  • অভিযান
  • পরিণীতা
  • ভেজা চোখ
  • আঁখি মিলন
  • নীতিবান
  • বেদের মেয়ে জোছনা
  • বেনাম বাদশা
  • সিপাহী
  • স্বজন
  • ত্যাগ
  • চেয়ারম্যান
  • শাস্তি

আরও অনেক চলচ্চিত্র

এর মধ্যে ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম পরিচিত সিনেমা। পাশাপাশি ‘পরিণীতা’ ও ‘শাস্তি’র মতো সিনেমায় তাঁর অভিনয়ও পুরস্কার ও সমালোচকদের স্বীকৃতি পেয়েছে।

ইলিয়াস কাঞ্চন ও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন

ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনের সঙ্গে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর প্রথম স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন মারা যান। সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে তিনি সামাজিক আন্দোলন শুরু করার উদ্যোগ নেন।

১৯৯৩ সালের ১ ডিসেম্বর ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে সংগঠনটি সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি, নিরাপদ সড়কের দাবি এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

এই কাজের কারণে ইলিয়াস কাঞ্চন চলচ্চিত্রের বাইরেও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন।

ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী ও পরিবার

ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রথম স্ত্রী ছিলেন জাহানারা কাঞ্চন। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। সে সময় ইলিয়াস কাঞ্চন শুটিংয়ের কাজে বান্দরবানে ছিলেন। জাহানারা তাঁর স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন।

জাহানারা কাঞ্চনের সঙ্গে ইলিয়াস কাঞ্চনের দুই সন্তান রয়েছে — মিরাজুল মঈন জয় এবং ইশরাত জাহান ইমা।

পরবর্তীতে ইলিয়াস কাঞ্চন অভিনেত্রী পারভীন সুলতানা দিতিকে বিয়ে করেন। তবে তাঁদের দাম্পত্য জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং পরবর্তীতে বিচ্ছেদ ঘটে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতিতে ইলিয়াস কাঞ্চন

অভিনয়ের পাশাপাশি ইলিয়াস কাঞ্চন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নেতৃত্বেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০২২ সালের ২৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ওই মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন নিপুণ আক্তার। ইলিয়াস কাঞ্চন ১৯১ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

২০২২–২০২৪ মেয়াদে তিনি সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে মেয়াদ শেষ হলে তিনি এই দায়িত্ব থেকে বিদায় নেন।

ইলিয়াস কাঞ্চনের পুরস্কার ও সম্মাননা

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ইলিয়াস কাঞ্চন বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতির মধ্যে রয়েছে—

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার – ‘পরিণীতা’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা
  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার – ‘শাস্তি’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতা
  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২১ – আজীবন সম্মাননা
  • একুশে পদক – সমাজসেবায় অবদানের জন্য
  • বাচসাস সম্মাননা
  • বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের সম্মাননা

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ২০২১ সালের আজীবন সম্মাননা ইলিয়াস কাঞ্চনের দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

এছাড়া নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি একুশে পদকও পেয়েছেন।

ইলিয়াস কাঞ্চনের সামাজিক অবদান

ইলিয়াস কাঞ্চনের পরিচিতি শুধু চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সড়ক নিরাপত্তা ও জনসচেতনতা তৈরির কাজ করে আসছেন।

সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং পথচারী ও চালকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগে তাঁর সংগঠন কাজ করেছে। এ কারণে বাংলাদেশের সামাজিক অঙ্গনেও ইলিয়াস কাঞ্চনের একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে।

ইলিয়াস কাঞ্চনের বর্তমান পরিচিতি

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ইলিয়াস কাঞ্চন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। একই সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠিত নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন তাঁকে চলচ্চিত্রের বাইরেও আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়, ‘বেদের মেয়ে জোছনা’র মতো জনপ্রিয় সিনেমা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও সামাজিক সচেতনতার ইতিহাসে পরিচিত একটি নাম।

ইলিয়াস কাঞ্চন সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন

ইলিয়াস কাঞ্চনের জন্ম কবে?

ইলিয়াস কাঞ্চন ১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার আশুতিয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম ইদ্রিস আলী।

ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রথম সিনেমার নাম কী?

ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রথম সিনেমা ‘বসুন্ধরা’। ১৯৭৭ সালে সুভাষ দত্ত পরিচালিত এই সিনেমার মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়।

ইলিয়াস কাঞ্চনের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা কোনটি?

‘বেদের মেয়ে জোছনা’ ইলিয়াস কাঞ্চনের সবচেয়ে পরিচিত সিনেমাগুলোর একটি। ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন অঞ্জু ঘোষ।

ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রথম স্ত্রী কে ছিলেন?

ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রথম স্ত্রী ছিলেন জাহানারা কাঞ্চন। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর ইলিয়াস কাঞ্চন নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয় হন।

ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন কবে শুরু হয়?

১৯৯৩ সালে জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যুর পর ইলিয়াস কাঞ্চন নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। একই বছরের ১ ডিসেম্বর নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়।